ত্বকের অজানা যত রোগ

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একটা বড় অংশ জুড়ে আছে ত্বকের যত্ন। নিজের ত্বকটাকে আরও সুন্দর ও আকর্ষণীয় করতে আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রূটি নেই। ত্বকের যত্ন এখন শুধুমাত্র রূপচর্চাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এর পরিসর বেড়েছে অনেক। গিয়েছে অনেক দূর। যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন প্রযুক্তি। এসেছে নতুন নতুন ডার্মো-কসমেটিকস। এসবের কল্যাণে এখন মোটামুটি সবাই ত্বকের যত্ন নিয়ে সচেতন। ত্বকের সব ধরণের সমস্যা সমন্ধে এখন অনেকেই খোঁজ খবর রাখেন এবং সেগুলো দূর করতে যথাসাধ্য চেষ্টাও করেন।

কিন্তু আসলেই কি আমরা ত্বকের সব ধরণের রোগ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল? না। তাহলে আসুন জেনে নেয়া যাক এমন কিছু ত্বকের রোগ যা সাধারণত আমরা জানি না-

একজিমা: একজিমা হলো ত্বকের এমন একটি অবস্থা যেখানে ত্বকে প্রদাহের সৃষ্টি হয়৷ একেক ধরনের একজিমার লক্ষণ একেক রকম হয়৷ তবে সাধারণভাবে লালচে, প্রদাহযুক্ত ত্বক; শুষ্ক, খসখসে ত্বক; ত্বকে চুলকানি; হাত ও পায়ের ত্বকের মধ্যে ছোট ছোট পানির ফুসকুড়ি ইত্যাদি হলো একজিমার লক্ষণ।

ডিটারজেন্ট, সাবান অথবা শ্যাম্পু থেকে একজিমার সংক্রমণ হতে পারে৷ অতিরিক্ত গরম বা অতিরিক্ত ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে ভেজা আবহাওয়াও একজিমার কারণ।

ডারমাটাইটিস: প্রদাহজনিত রোগের মধ্যে ডারমাটাইটিসই ত্বকে সর্বাধিক দেখা যায়। অনেকে ত্বকে কোনো ধরনের র‍্যাশ/ফুসকুঁড়ি হলেই ডারমাটাইটিস বা একজিমা মনে করেন, এ ধারণা ঠিক না। আবার ডারমাটাইটিস এবং একজিমা সম্পূর্ণ আলাদা রোগ। ডারমাটাইটিস ছাড়াও ত্বকের অনেক রোগে র‍্যাশ/ ফুসকুঁড়ি দেখা যায়। এটি কোনো বিশেষ স্থান বা সমস্ত শরীরে হতে পারে। নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাই আক্রান্ত হতে পারেন।

কি উপায়ে বা কি কারণে ডারমাটাইটিস হয়েছে, এর ওপর ভিত্তি করে একে ভাগ করা হয়ে থাকে। যেমন- আল্ল্যেরজিক কনটাক, ইররইতেন্ত কনটাক, এটোপিক বা বংশগত, ডিসহাইড্রটিক, সেবরিক, লিচেন সিমপ্লেক্সক্রনিকাস নুম্মুলার, ডাইয়াপার, স্তাসিস, কসমেটিক বা প্রসাধনীজনিত ইত্যাদি।

সোরিয়াসিস: সোরিয়াসিস ত্বকের একটি জটিল রোগ৷ তবে এটি কেবল ত্বক নয়, আক্রমণ করতে পারে শরীরের অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও৷ যেমন সন্ধি, নখ ইত্যাদি৷ সাধারণত ত্বকের কোষস্তর প্রতিনিয়ত মারা যায় এবং নতুন করে তৈরি হয়৷ সোরিয়াসিসে এই কোষ বৃদ্ধির হার অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে৷ ত্বকের কয়েক মিলিমিটার থেকে কয়েক সেন্টিমিটার জায়গাজুড়ে এই সমস্যা দেখা দেয়৷ রোগ যত পুরোনো হয়, ততই জটিল হতে থাকে৷ তাই দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার আওতায় আসা জরুরি৷ আক্রান্ত ব্যক্তিকে আজীবন চিকিৎসা নিতে হয়৷ সোরিয়াসিস বংশগতভাবে হতে পারে৷

আর্সেনিকের কারণে চর্মরোগ: আর্সেনিক যুক্ত পানি খেলে ত্বকে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে৷ যেমন ত্বকের গায়ে ছোট ছোট কালো দাগ কিংবা পুরো ত্বক কালো হয়ে যেতে পারে, হাত ও নখের চামড়া শক্ত ও খসখসে হয়ে যেতে পারে৷ এছাড়া ত্বকের বিভিন্ন স্থানে সাদা-কালো দাগ দেখা দেয়াসহ হাত ও পায়ের তালুর চামড়ায় শক্ত গুটি বা গুটলি দেখা দিতে পারে৷ তবে চিন্তার বিষয় হলো, আর্সেনিক যুক্ত পানি পানের শেষ পরিণতি হতে পারে কিডনি ও লিভারের কর্মক্ষমতা লোপ পাওয়া; ত্বক, ফুসফুস ও মূত্রথলির ক্যানসার হওয়া; কিডনির কার্যক্ষমতা লোপ পাওয়া ইত্যাদি৷

ভিটিলিগো: আরেক নাম শ্বেতী রোগ। ভিটিলিগো এক ধরনের চর্মরোগ, যাতে শরীরের ত্বকের ম্যালানোসাইট কোষগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। ত্বকের এই ম্যালানোসাইট ধ্বংসের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণটাই শরীরের ভেতরের একটি প্রক্রিয়া। আক্রান্ত অংশে ত্বকের ম্যালানোসাইটগুলো মেলানিন তৈরি করতে পারে না। তাই আক্রান্ত অংশ অতিরিক্ত সাদা বর্ণের হয়ে থাকে।

নারী কিংবা পুরুষ যে কোনো বয়সেই এই শ্বেতী রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সাধারণত শরীরের যেসব অঙ্গ আবরণমুক্ত থাকে যেমন- হাত, পা, মুখমণ্ডল এবং ঠোঁট ইত্যাদি অংশে শ্বেতী বেশি দেখা যায়। তবে শ্বেতী শরীরের যে কোনো অংশেই দেখা দিতে পারে।

ভাইরাল ওয়ার্টস: ভাইরাল ওয়ার্টস এক ধরনের টিউমারের মত গ্রোথ। ত্বকের অংশ বিশেষ শক্ত, মোটা, খসখসে দাবার মত বৃদ্ধি পায়। ভাইরাল ওয়ার্টস এইচপিভি বা হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস দ্বারা শরীরে সঅংক্রমিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি সংস্পর্শেও এই ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট আঁচিল অন্যের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আঁচিল বা ভাইরাস ওয়ার্টস-এ চুলকায়। তখন আক্রান্ত স্থান চুলকালে বা ঘসলে এই ভাইরাস ত্বকের স্বাভাবিক স্থানেও ছড়াতে পারে। শুরুতে আঁচিলগুলো ছোট, দানারমত থাকে এবং প্রাথমিক অবস্থায় তুলে ফেলা হলে আঁচিলের সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।

রোসাকিয়া: আপনারা অনেক সময়েই মুখ খুব লালচে হয়ে থাকতে দেখেছেন হয়ত। মুখে বেশ কিছু লাল লাল দাগও দেখেছেন নিশ্চয়ই। রোসাকিয়া নামিক ত্বকের সমস্যায় যারা ভোগেন তাদের এটা বেশি হয়। এই মানুষরা যখন বাইরে রোদে যান তখন বা অতি মাত্রায় খুশি বা দুঃখিত হলে মুখ বেশি লাল হয়ে যায়। কখনও কখনও এই সমস্যা খুব বড় আকার নেয়। মুখ চুলকাতে শুরু করে। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার একটাই উপায় হল মুখে ইউ.ভি.এ বা ইউ.ভি.বি সমৃদ্ধ ক্রিম ব্যবহার করা।

Facebook Comments